সুরঝংকার : পুণেতে বাংলার চালচিত্র 

    সুরঝংকার , একটি রেজিস্ট্রিকৃত চ্যারিটেবল সংগঠন, কয়েকজন উৎসাহী বাঙালির প্রচেষ্টায় ১৯৯৪ সালে পুণেতে স্থাপিত হয়। এই উদ্যমের পেছনে ছিল একটি মনোজ্ঞ এবং সংগঠিত প্রয়াস যাতে পুণের মাটিতে বঙ্গ সংস্কৃতির বীজ প্রোথিত হয় এবং সাথে সাথে স্থানীয় সংস্কৃতির সাথে তার একটি মেলবন্ধন গড়ে ওঠে।

    কলকাতার ‘গীতবিতান’এর প্রথানুযায়ী রবীন্দ্রসঙ্গীত শিক্ষার জন্য শিক্ষায়তন স্থাপন করা ছিল সুরঝংকারের প্রথম কার্যকলাপ। এই শিক্ষায়তনটি ক্রমশ প্রসার লাভ করেছে বছরের পর বছর অসংখ্য শিক্ষাব্রতীদের উৎসাহে। প্রচুর ছাত্র-ছাত্রী সাফল্যের সঙ্গে ‘গীতবিতান’এর ‘গীতভারতী’ ডিগ্রী কোর্সটি সম্পূর্ণ করেছেন। প্রসঙ্গত উল্লেখ্য যে ‘গীতভারতী’ গত ৫০ বছর যাবত কলকাতার একটি জনপ্রিয় ডিগ্রী কোর্স, যা হল বি-মিউজ ডিগ্রীর সমকক্ষ ও স্বীকৃত।

    রবীন্দ্রনাথের মৃত্যুর অব্যবহিত পরেই তাঁর দ্বারা নির্দিষ্ট পথে ও পদ্ধতিতে কলকাতায় রবীন্দ্রসঙ্গীত শিক্ষার একটি প্রয়াস নেওয়া হল। সেই উদ্দেশ্যে ইন্দিরা দেবী ও শৈলজারঞ্জন মজুমদারের উদ্দোগে ১৯৪১ সালের ডিসেম্বর মাসে কলকাতায় ‘গীতবীতান’ স্থাপিত হল। শান্তিনিকেতনের সঙ্গীতভবনের শিক্ষক, শিক্ষিকাগণ, যথা অনাদিকুমার দস্তিদার, কনক বিশ্বাস, নিহারবিন্দু সেন, শুভ গুহঠাকুরতা ইত্যাদিরা এগিয়ে এলন শিক্ষা প্রদান করবার জন্য।

    গীতবীতান ৫ বছরের তিনটি ডিগ্রী কোর্স অবতারণা করল – রবীন্দ্রসঙ্গীতের জন্য গীতভারতী উপাধি, উচ্চাঙ্গ সঙ্গীতের জন্য সঙ্গীতভারতী উপাধি ও নাচের জন্য নৃত্যভারতী উপাধি প্রদান শুরু হল। এই ডিগ্রী কোর্সগুলি একাধার কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়, বিশ্বভারতী ও রবীন্দ্রভারতী বিশ্ববিদ্যালয় দ্বারা স্বীকৃতি হল ঐ বিশ্ববিদ্যালয়গুলির বি-মিউজিক ডিগ্রীর সমকক্ষ উপাধি হিসেবে। গত সত্তর বছর যাবত এই তিনটি ডিগ্রী জনপ্রিয়তা পেয়ে চলেছে।

    রবীন্দ্রসঙ্গীত শিক্ষাকে সুপ্রথিত করবার জন্য সুরঝংকার অসংখ্য অনুষ্ঠান মঞ্চস্থ করেছে। রবীন্দ্রনাথের সৃষ্টির উপস্থাপনাকে এক পৌনঃপুনিক গতানুগতিকতা থেকে মুক্ত করে এই মঞ্চ সফল অনুষ্ঠানগুলি রবীন্দ্রনাথের সাংস্কৃতিক দর্শনের এক সহজতর ব্যাখ্যা এনে দিয়েছে দর্শক/শ্রোতাদের কাছে।

    ২০০৪ সাল থেকে সুরঝংকার বাংলা সংস্কৃতির আর এক শূন্যস্থান পূরণ করে চলেছে। পুণেবাসী বাঙালি ও অবাঙালি ছাত্র-ছাত্রীদের বাংলা ভাষা শিক্ষার ভার গ্রহণ করে চলেছে। ২০১২ সাল থেকে সঙ্গীতশিক্ষা ও বাংলা ভাষা শিক্ষা ছড়িয়ে পড়েছে কোরেগাঁও পার্ক অঞ্চলে, যেখানে পুণে ব্লাইন্ড স্কুল ভবনে সেই স্কুলের ছাত্র-ছাত্রীদের রবীন্দ্রসঙ্গীত শেখানো হচ্ছে। প্রায় শতাধিক ছাত্র-ছাত্রী বর্তমানে সুরঝংকারের নানা শ্রেণীতে গান বা ভাষা শিখছে। পুণের শিক্ষিত ও বুদ্ধিজীবী সমাজের কাছে থেকে সুরঝংকার পৃষ্ঠপোষকতা পেয়ে চলেছে। এক বৈচিত্র্যপূর্ণ সাংস্কৃতিক চর্চাকে এগিয়ে নিয়ে যাবার জন্য সুরঝংকারের সামনে এক বিস্তৃত দিগন্ত ছড়িয়ে আছে।